বুধবার, ০৮ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:৪৭ পূর্বাহ্ন
নিজস্ব প্রতিনিধি, কেরানীগঞ্জঃ
ঢাকার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের কদমতলী এলাকায় ‘মেসার্স সেজার্স গ্যাস প্রো’ লাইটার কারখানাটিতে আগেও দুবার আগুন লেগেছিল। এরপর নানা অনিয়মের কারণে প্রশাসন কারখানাটি সিলগালা করে দেয়। কাগজপত্রে ‘বন্ধ’ থাকা সেই কারখানায় গতকাল শনিবার ভয়াবহ আগুনে পুড়ে অঙ্গার হয়েছেন ছয়জন। আগুনের ভয়াবহতায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে গোটা এলাকায়। তবে দীর্ঘদিন ধরে সিলগালা করা কারখানা চলল কীভাবে, সে প্রশ্নের উত্তর মেলেনি কারও কাছে।
ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ছয়জনের মরদেহ এতটাই পুড়েছে যে তারা নারী না পুরুষ, তা বোঝা যাচ্ছে না। পরিচয় শনাক্ত না হওয়ায় নিহতরা কারখানাটির শ্রমিক না কর্মকর্তা, তাও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। আগুন লাগার কারণও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তদন্ত করে কারণ বের করা হবে।
আগুনে আহত হয়ে কয়েকজন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। গতকাল সন্ধ্যায় এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত বেশ কয়েকজন শ্রমিককে খুঁজে পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন স্বজনরা। তারা পোড়া কারখানার আশপাশে অবস্থান করে স্বজনকে খুঁজছিলেন। আগুন নেভানোর পর ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ভেতরে তল্লাশি কার্যক্রম শুরু করেন।
এদিকে আগুনে হতাহতের ঘটনায় গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এটি অত্যন্ত বেদনাদায়ক ঘটনা। এই প্রাণহানির ক্ষতি অপূরণীয়।’
আহতদের সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। এক বিবৃতিতে শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়ে নিহতদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করেছেন তিনি। পাশাপাশি তদন্তের মাধ্যমে দুর্ঘটনার কারণ অবিলম্বে খুঁজে বের করে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির নির্দেশ দিয়েছেন।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স সদর দপ্তরের মিডিয়া উইংয়ের কর্মকর্তা আনোয়ারুল ইসলাম দোলন জানিয়েছেন, তারা দুপুর ১টা ১১ মিনিটে গ্যাস লাইটার তৈরির কারখানায় আগুন লাগার খবর পান। চার মিনিটের মধ্যেই কেরানীগঞ্জ ফায়ার স্টেশন থেকে দুটি ইউনিট ঘটনাস্থলে গিয়ে আগুন নেভাতে শুরু করে। এরপর সদর দপ্তরসহ অন্যান্য স্টেশন থেকে আরও পাঁচটি ইউনিট তাতে যুক্ত হয়।
ফায়ার সার্ভিসের এই কর্মকর্তা বলেন, বেলা আড়াইটার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে নেওয়া সম্ভব হলেও বিকেল পৌনে ৫টার দিকে তা পুরোপুরি নেভানো সম্ভব হয়। এরপর ভেতরে তল্লাশি শুরু হয়।
ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা বলছেন, গ্যাস লাইটার তৈরির কারখানাটি টিনশেড ছিল। সাধারণভাবেই এর ভেতরে নানা দাহ্য বস্তু রাখা ছিল। তবে আগুন প্রতিরোধের মতো কোনো ব্যবস্থা চোখে পড়েনি। এ জন্য দ্রুতই আগুন ছড়িয়ে পড়ে।
ফায়ার সার্ভিসের উপসহকারী পরিচালক (ঢাকা দক্ষিণ) ফয়সালুর রহমান জানান, আগুন নেভানোর পর উদ্ধারকর্মীরা ভেতরে তল্লাশি চালিয়ে পুড়ে অঙ্গার হওয়া পাঁচটি মরদেহ উদ্ধার করে। এ ছাড়া রাত সোয়া ১২টার দিকে আরও একজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
তিনি জানান, এতটাই পুড়েছে যে তারা নারী না পুরুষ, তা বোঝা যাচ্ছে না। এজন্য দাবিদার থাকলেও লাশ হস্তান্তর করা হয়নি। ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে পরিচয় নিশ্চিত হয়ে লাশ হস্তান্তর করা হবে।
তিনি আরও বলেন, কারখানাটি টিন-কাঠ-লোহার কাঠামোতে তৈরি হওয়ায় আগুনে তা রীতিমতো ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। তাই এসব পোড়া ধ্বংসস্তূপ সরাতে সময় লাগছে। ভেতরে আর কারও মরদেহ রয়েছে কি না, তা তল্লাশি কার্যক্রম শেষে নিশ্চিত হওয়া যাবে।
ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, আগুন লাগা কারখানাটি থেকে ঘন কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলী অনেক ওপরে উঠছিল, যা আশপাশের এলাকা থেকেও দেখা যাচ্ছিল। পুরো কারখানাটিই দাউ দাউ করে জ্বলছিল। ফায়ার সার্ভিসের সঙ্গে স্থানীয় লোকজনও আগুন নেভাতে সহায়তা করে।
স্থানীয় লোকজন বলছেন, কারখানাটিতে অন্তত ২০০ শ্রমিক কাজ করে। হয়তো ঈদের ছুটি শেষে অনেকে যোগ না দেওয়ায় গতকাল শ্রমিক সংখ্যা কম ছিল। কারখানাটিতে নারী-পুরুষের সঙ্গে ১২ থেকে ১৪ বছরের শিশুরাও শ্রমিক হিসেবে কাজ করত।
কেরানীগঞ্জ উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) আফতাব আহমেদ জানিয়েছেন, গ্যাস লাইটার কারখানাটিতে আগেও দুবার অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছিল। পরে তদন্ত করে কারখানাটিকে সিলগালা করা হয়। কিন্তু সেটি কবে পুনরায় চালু করা হয়েছে, তা তিনি জানেন না।
স্থানীয় লোকজন বলছেন, আগুন লাগার পর কারখানাটির ভেতরে থাকা গ্যাস সিলিন্ডারগুলো একের পর এক বিস্ফোরিত হচ্ছিল। এর শব্দে আশপাশের এলাকা প্রকম্পিত হয়। এতে স্থানীয়রা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন।
কারখানাটিতে কাজ করে মীম আক্তার নামে এক কিশোরী। সে তার দাদি পারভীন বেগমের সঙ্গে গতকাল সকালে কারখানায় কাজে যায়। আগুন লাগার পর মীম বের হতে পারলেও সন্ধ্যা পর্যন্ত তার দাদির সন্ধান মেলেনি।
মীম আক্তার জানায়, ‘হঠাৎ করেই বিকট শব্দের পর আগুন ধরে যায়। সেসহ অনেকেই বেরিয়ে আসে। তবে ভিড়ের মধ্যে তার দাদিকে আর পাওয়া যায়নি।’
আগুন নেভানোর পর সন্ধ্যার দিকে পারভীন বেগমের খোঁজ করছিলেন মীমের বাবা জাহিদ হোসেন। তিনি বলেন, তার মা দেড় বছর ধরে কারখানাটিতে কাজ করেন। ছয় মাস ধরে দাদির সঙ্গে মীমও সেখানে কাজ করছে। গতকালও তারা কাজে এসেছিল। কিন্তু মীম কাঁদতে কাঁদতে বাসায় গিয়ে জানায়, কারখানায় আগুন লেগেছে, দাদিকে খুঁজে পাচ্ছে না।
জাহিদ বলেন, ‘এরপর তারা কারখানার সামনে ছুটে আসেন। তখনো আগুন জ্বলছিল; কিন্তু আগুন নেভানোর পরও মায়ের সন্ধান পাচ্ছি না।’
মাদারীপুরের কালকিনীর বাসিন্দা শাহিনূর বেগম চলতি মাসেই কারখানায় কাজে যোগ দিয়েছিলেন। আগুন লাগার পর স্বজন তাকেও খুঁজে পাচ্ছেন না। গতকাল সন্ধ্যায় কারখানাটির পোড়াস্তূপে শাহিনূরের খোঁজ করতে দেখা যায় স্বজনকে। তারা মোবাইল ফোনে ওই নারীর ছবি দেখিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন।